, ,

সংবাদ সরাও, অন্যথায় ফল ভুগতে হবে: ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকি

শিউলী
প্রকাশিত October 22, 2026, 05:19 PM
সংবাদ সরাও, অন্যথায় ফল ভুগতে হবে: ট্রাম্প প্রশাসনের হুমকি

মার্কিন সংবাদমাধ্যম পলিটিকোকে প্রকাশিত তিনটি প্রতিবেদন ‘প্রত্যাহার বা সংশোধনের’ জন্য ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি পূরণ না করলে সংবাদমাধ্যমটির বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা নির্দিষ্ট না করলেও ‘উপযুক্ত ও বিদ্যমান সব আইনি পদক্ষেপ’ বিবেচনার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হোয়াইট হাউস। গত সোমবার এই বিষয়ে চিঠি পাঠানো হয় এবং আজ বৃহস্পতিবার এই সময়সীমা শেষ হচ্ছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের খবরে বলা হয়েছে, হোয়াইট হাউসের আইনবিষয়ক প্রধান উইল শার্ফ পলিটিকোর গ্লোবাল এডিটর ইন চিফ জোনাথন গ্রিনবার্গারকে পাঠানো চিঠিতে বিতর্কিত প্রতিবেদনগুলো অবিলম্বে সংশোধন বা প্রত্যাহার, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও হোয়াইট হাউসের চিফ অব স্টাফ সুসি ওয়াইলসের কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ডিজিটাল আর্কাইভ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

শার্ফের অভিযোগ, পলিটিকোর প্রতিবেদনগুলোতে সুসি ওয়াইলসকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের আগে হোয়াইট হাউসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এবং প্রেসিডেন্ট নিজেও এসব তথ্য অস্বীকার করেছিলেন বলে দাবি করেন তিনি। তবে পলিটিকো এখন পর্যন্ত প্রতিবেদনগুলো সংশোধন বা প্রত্যাহার করেনি। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলেও সংবাদমাধ্যমটির এক মুখপাত্র কোনো জবাব দেননি।

তিনটি প্রতিবেদন ঘিরে বিরোধ
বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ১৫ ও ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত পলিটিকোর তিনটি প্রতিবেদন। ১৫ অক্টোবর প্রকাশিত ‘ট্রাম্পের বরফশীতল নারী সহযোগী এখন চাপের মুখে’ শিরোনামের প্রতিবেদনে বলা হয়, ট্রাম্প সুসি ওয়াইলসের পরিবর্তে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার কথা বিবেচনা করছেন। ট্রাম্প প্রতিবেদনটিকে ‘ভুয়া খবর’ বলে অভিহিত করেন।

পরদিন প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, আগের দিনের প্রতিবেদন প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয় এবং ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র ওই প্রতিবেদনকে ‘অবিশ্বাস্য রকমের বোকামিপূর্ণ ও মিথ্যা’ বলে মন্তব্য করেন।

১৬ অক্টোবর প্রকাশিত তৃতীয় প্রতিবেদনে পলিটিকো ইঙ্গিত দেয়, ফক্স নিউজে শন হ্যানিটির অনুষ্ঠানে কেটি জাকারিয়ার সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা করেছিলেন সুসি ওয়াইলস, যাতে সাক্ষাৎকারে জাকারিয়া বিপাকে পড়েন। সাক্ষাৎকারটি আগের রাতে প্রচারিত হয়েছিল। হোয়াইট হাউস ও ফক্স নিউজ উভয়ই এই দাবি অস্বীকার করে।

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা প্রতিবেদন প্রকাশের আগেই পলিটিকোকে কিছু খুদে বার্তা সরবরাহ করেছিলেন। সেগুলোতে দেখা যায়, সাক্ষাৎকারের ব্যবস্থা ওয়াইলস নয়, জাকারিয়া নিজেই করেছিলেন। পরদিন *নিউইয়র্ক পোস্ট* এ তথ্য প্রকাশ করে।

শার্ফের অভিযোগ, পলিটিকো এসব তথ্য ও প্রতিবাদ উপেক্ষা করে প্রতিবেদনগুলো বহাল রেখেছে। তাঁর ভাষায়, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা কোনো পেশাগত দায়মুক্তি নয়, যার আড়ালে জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়া যায়। তিনি আরও দাবি করেন, পলিটিকোর একজন প্রতিবেদক জানিয়েছেন, ওয়াইলসকে প্রতিবেদন থেকে বাদ দেওয়া হয়নি, কারণ তিনি ছিলেন প্রতিবেদনের ‘মূল আকর্ষণ’। শার্ফ এই বক্তব্যকে আইনগতভাবে উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেন।

সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে ট্রাম্পের সংঘাত বাড়ছে
পলিটিকোর বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের এই হুঁশিয়ারি এমন এক সময়ে এল, যখন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্পর্ক আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ। পলিটিকো, সিএনএন ও এমএস নাউকে ওভাল অফিস এবং প্রেসিডেন্টের উড়োজাহাজ এয়ার ফোর্স ওয়ানে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ট্রাম্পের সংবাদ পরিবেশন তাঁর পছন্দ না হওয়াই এসব পদক্ষেপের কারণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই তিনটি সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউস প্রাঙ্গণে প্রবেশের সুযোগ থেকেও নিষিদ্ধ করেছিলেন ট্রাম্প। তবে গত ১৩ অক্টোবর এক বিচারক তাঁদের প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল করেন। এদিকে, এয়ার ফোর্স ওয়ানে প্রবেশাধিকার এবং প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সফরকারী টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমগুলোর সম্মিলিত সংবাদ সংগ্রহকারী দলে অংশগ্রহণের সুযোগ ফিরে পেতে বুধবার আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিয়েছে সিএনএন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেও একই ধরনের বিরোধ দেখা যায়। মেক্সিকো উপসাগরকে ‘আমেরিকা উপসাগর’ নামে অভিহিত করার বিষয়ে ট্রাম্পের অবস্থান মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোর পর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) ওভাল অফিস ও এয়ার ফোর্স ওয়ানে সংবাদ সংগ্রহের সুযোগ থেকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। কয়েক মাস পর এক ফেডারেল বিচারক এপির প্রবেশাধিকার পুনর্বহাল করেন।

এদিকে, নিউইয়র্ক টাইমস চলতি সপ্তাহে জানিয়েছে, ট্রাম্প হোয়াইট হাউসের জেমস এস ব্র্যাডি প্রেস ব্রিফিং রুম থেকে সাংবাদিকদের পুরোপুরি সরিয়ে দিয়ে সেখানে একটি সুইমিং পুল নির্মাণের কথা ভেবেছেন।

‘সব বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে’
পলিটিকোর বিরুদ্ধে ঠিক কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট করেননি শার্ফ। তবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ‘সব বিকল্পই বিবেচনার টেবিলে রয়েছে।’ তাঁর ভাষায়, ট্রাম্পের আইনবিষয়ক প্রধান এবারের ‘ক্ষোভ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আলাদা।’

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা পলিটিকোর নতুন ব্যবস্থাপনারও সমালোচনা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, নতুন ব্যবস্থাপনা সংবাদকর্মীদের গুজবনির্ভর প্রতিবেদন প্রকাশে উৎসাহিত করছে। শার্ফ এ ধরনের সাংবাদিকতাকে ‘গসিপ-পেডলিং’ বা গুজব ছড়ানোর সাংবাদিকতা বলে আখ্যা দিয়েছেন।

সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের প্রবণতা রয়েছে। তাঁর উপদেষ্টাদের মতে, সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আগ্রহ তাঁর কমেনি।

এদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের বাইরের কয়েকজন উপদেষ্টার ধারণা, প্রশাসনের কর্মকর্তারা পলিটিকোর বিরুদ্ধে বিদেশি প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তোলার পথ তৈরি করতে পারেন। এর যুক্তি হিসেবে সংবাদমাধ্যমটির মালিকানাধীন জার্মান কোম্পানি অ্যাক্সেল স্প্রিঙ্গারের পরিচয় সামনে আনা হতে পারে।

গত শনিবার হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিয়াং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পলিটিকোকে ‘বিদেশি পরিচালিত অভিযান’ হিসেবে আখ্যা দেন। তাঁর অভিযোগ, সংবাদমাধ্যমটি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ এবং বিভ্রান্তিকর ও ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেশটির নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে।

পলিটিকোর বিরুদ্ধে এই হুঁশিয়ারি শেষ পর্যন্ত কী পদক্ষেপে গড়ায়, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে প্রতিবেদন প্রত্যাহার, প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা এবং সম্ভাব্য আইনি ব্যবস্থার হুমকি যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন ও সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যকার সংঘাতকে আরও তীব্র করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।