সাত কলেজের দখল নিয়ে ছাত্রলীগে কাদা ছোড়াছুড়ি

প্রকাশিত: 6:00 PM, September 15, 2023

সাত কলেজের দখল নিয়ে ছাত্রলীগে কাদা ছোড়াছুড়ি

জাতীয় ডেস্ক :

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছাত্রলীগ আয়োজিত ছাত্র সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে যথাযথ মূল্যায়ন ও আর্থিক সহায়তা না করা, ঢাবি শাখার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে বক্তৃতা ও প্রধানমন্ত্রীর সামনে বক্তব্য দেয়ার সুযোগ করে না দেয়াসহ বিভিন্ন কারণে নিয়ে সম্পর্কের টানাপোড়েন চলছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের মধ্যে। তবে বিরোধের মূলে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজ ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে।

এতদিন এগুলো কেন্দ্রীয় সংগঠন নিয়ন্ত্রণ করলেও এখন এসব কলেজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে চান ঢাবি শাখার নেতারা। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন গঠনতন্ত্র অনুসরণ করে ছাত্রলীগের ইউনিট সমূহের কমিটি গঠন করা হবে। সাত কলজের এ নিয়ন্ত্রণ করাকে নিয়ে চলছে উত্তেজনা, এমনকি হামলার ঘটনাও ঘটছে। ফলে ঢাবিতে সহিংসতার আশংকা রয়েছে বলে মনে করছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

১৪ সেপ্টেম্বর ভোররাত ৩ টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগ কর্মী কাওসার হাসান কায়েস ও সাব্বির হোসাইনকে বেধড়ক মারধরের ঘটনা ঘটেছে। পরে রাতেই আহতদের দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আসেন ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের কয়েকশ নেতাকর্মী ও কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান। সাত কলেজ ছাত্রলীগ নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের টানাপোড়েনের প্রেক্ষিতে এই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

গত ১৭ জুলাই ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের নেতারা ঢাবি শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত করলে সেখানে অধিভুক্ত কলেজগুলোর সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার কথা বলেন শয়ন-সৈকত। একদিন পরেই ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের পদপ্রত্যাশীদের থেকে সিভি আহ্বান করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। যার মাধ্যমে অধিভুক্ত কলেজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার বার্তা দেন কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনান।

এদিকে গত ১২ সেপ্টেম্বর সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় সভা করে ঢাবি ছাত্রলীগ। সভা শেষে প্রশ্নের জবাবে তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে সাত কলেজের কমিটি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সাত কলেজের রাজনীতিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির মতো সুশৃঙ্খল ও সুন্দর করতে চান বলে জানান তিনি।

ঢাবি সাধারণ সম্পাদকের এমন বক্তব্যের প্রতিবাদে একইদিন সন্ধ্যায় নিউমার্কেট এলাকায় মিছিল করে ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের একাংশ। পরের দিন ১৩ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেছে অধিভুক্ত সরকারি বাঙলা কলেজ ও নজরুল কলেজ ছাত্রলীগের একাংশ ।

এছাড়াও এসব দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র ছাত্রলীগের করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অধিভুক্ত সাত কলেজে ঢাবি ও কেন্দ্রীয় নেতাদের অনুসারীদের মধ্যেও অনলাইন অফলাইনে সমালোচনা ও বাকবিতন্ডা লক্ষ্য করা যায়।

ঢাবি ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্যে ক্ষেপেছেন ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্না জেসমিন রিভাও। সৈকতকে উদ্দেশ্য করে তিনি লিখেন, ‘আপনি আগে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র পড়েন, তারপর কথা বলেন। একটা জেলা ইউনিটকে কোন সাহসে আপনি উপজেলা ইউনিট বানাতে চান? আপনি যত শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব দেন আমি তার থেকে বেশি শিক্ষার্থীর নেতৃত্ব দেই।’

ইডেন কলেজের সহ-সভাপতি সুস্মিতা বড়াই ঢাবি ছাত্রলীগকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, ‘আগে ৭ কলেজ থেকে ঢাবির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হোক। হল কমিটিগুলোর ভাগ হোক। তারপরে কথা হবে।’

তিতুমীর কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি রিপন মিয়া লিখেন, ‘ঢাবির অধিভুক্ত সাত কলেজ ছাত্রলীগের যোগ্য কর্মীদের মধ্যে থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি,সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হোক।’

বঙ্গবন্ধু হল ছাত্রলীগের গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল মমিন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগকে উদ্দেশ্য করে লিখেন, ‘আপনাদের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে পথচলা মসৃণ হোক। লজ্জা শরম থাকলে মধুতে আর আসবেন না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সাত কলেজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের আন্ডারে নিয়ে আসলে সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ঢাবি পরিচয় দেওয়ার দাবি আরও জোরদার হবে। ভবিষ্যতে লাইব্রেরি ব্যবহার,বাস ব্যবহার এমনকি হল ব্যবহারের দাবিগুলোও আসতে পারে। নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করতে গিয়ে ডেকে ষাড় পোয়াল গাদায় নিয়ে আসার মতো বোকামি আর হয় না। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীরা এহেন সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারি না।’

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘সাত কলেজ ছাত্রলীগকে নিয়ে আসা নিয়ে যে দ্বন্দ্ব একটি উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ফেসবুকে নেতাকর্মীদের বিতর্কিত পোস্ট, এক পক্ষকে লক্ষ করে অন্যা পক্ষের বিক্ষোভ মিছিল হচ্ছে। আজকে মারামারির ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয় নিয়ে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আমরা সাধারণ শিক্ষার্থী হিসেবে নিরাপত্তাহীনতা, পড়াশোনার পরিবেশ বিঘ্নিত হওয়ার মতো বিষয়ের সম্মুখীন হতে হবে।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সরকারি সাত কলেজ ছাত্রলীগকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের অধীনে নিয়ে আসার বিষয়ে সাধারণ সম্পাদক ইনান বলেন, ‘এটি একটি সাংগঠনিক বিষয়। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাজ হবে। গঠনতন্ত্র ছাত্রলীগের সকল নেতাকর্মীদের কাছে সংবিধান। গঠনতন্ত্রে যেভাবে ছাত্রলীগের ইউনিট সমূহের কমিটি গঠন করার কথা রয়েছে সেভাবেই কাজ করা হবে।’

এ বিষয়ে তানভীর হাসান সৈকত বলেন, ছাত্রলীগের বিষয়ে আমাদের ব্যাক্তিগত কোনো বিষয় না। রাজনৈতিক ফোরাম থেকে হাইকমান্ডের যে সিদ্ধান্ত আসে তা আমরা মেনে নিবো। কারো অনুসারী যদি কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য করে এটা ঠিক না। এটা ছাত্রলীগের সংস্কৃতি না। আমরাও চাইলে আমাদের অনুসারীদেরকে দিয়ে জুতা মিছিল, ঝাড়ু মিছিল বা অন্যান্য মিছিল করাতে পারি। সাত কলেজের বিষয়টিকে আমরা আমাদের যুক্তি তুলে ধরেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের যে কর্মী আহত হয়েছে সে অনেকদিন ধরে ছাত্রলীগের রাজনীতি করে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায়ি আসা যাওয়া করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে করা হলে সে তাদেরকে চিনতো। মারামারি করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সংস্কৃতি না।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ড. মাকসুদূর রহমান বলেন, ‘ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বিষয়টি আমরা সামগ্রিকভাবে দেখে থাকি। ছাত্রসংগঠনগুলোকেও ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা বিষয়টিকে চিন্তা করতে হবে। নিরাপত্তা বিষয়ে আমরা ছাত্রসংগঠনগুলোকে কাউন্সিল করে থাকি। কেউ যদি ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি ব্যাঘাত ঘটায় তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে’

R/N

আমাদের তথ্যচিত্র গান কবিতা নাটক ভালো লাগলে ফেসবুকে শেয়ার করুন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

0Shares