রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ

প্রকাশিত: 6:07 PM, January 23, 2024

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ

 

জাতীয় ডেস্ক:

জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে হৃদরোগ চিকিৎসায় নিখুঁতভাবে রোবট দিয়ে হার্টের রিং পরানো হলো। ফলে প্রথমবারের মতো রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি যুগে প্রবেশ করলো বাংলাদেশ। রোববার (২১ জানুয়ারি) বাংলাদেশের একমাত্র বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে দুইজন হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর প্রধান ধমনীতে বিনামূল্যে রোবটিক পদ্ধতিতে রিং পরানো হয়।

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি চিকিৎসা পদ্ধতিটি উদ্বোধন করেন প্রতিষ্ঠানটির সহযোগী অধ্যাপক ডাক্তার প্রদীপ কুমার কর্মকার ও তার বিশেষায়িত টিম, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা: মো. কামরুল হাসান মিলন এবং কার্ডিলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা: মো. সালাউদ্দিন উল্লুবি।

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি যে কোনো দেশের জন্য যুগান্তকারী ও সর্বাধুনিক হৃদরোগ চিকিৎসা পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো কোনো চিকিৎসা সেবা দেয়া হলো। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সহ বিশ্বে ১৬০ টি দেশে রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টি ( রোবট দিয়ে হার্টের রিং পরানো) সেন্টার রয়েছে। এর মধ্যে ভারতের রয়েছে ছয়টি সেন্টার।

 

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি বর্তমান পৃথিবীতে হার্টের রিং পরানোর সর্বাধুনিক এবং সর্বশেষ প্রযুক্তি। কার্ডিওলজিস্টরা এখনও ক্যাথল্যাবে নিজেরা রোগীর কাছ থেকে রোগীদের হার্টের রিং পরান। যার সর্বশেষ আবিষ্কার হল, রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টি অর্থাৎ রোবট দিয়ে হার্টের রিং পরানো।

এর মাধ্যমে হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা রোগীর চেয়ে দূরে থেকে নিখুঁতভাবে হৃদরোগীদের হার্টের ধমনীতে রিং পরান। এই রোবটের দুটি অংশ থাকে। একটি হলো রোবটের একটি হাত, যা ক্যাথল্যাবে থাকে। আরেকটি থাকে কন্ট্রোল সেকশনে, যেখান থেকে মূল কার্ডিওলজিস্ট পুরো রিং পরানো কার্যক্রমটি দূর থেকে সম্পন্ন করে থাকেন।

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি বা রোবট দিয়ে হার্টের রিং পরানোর তিন ধরনের সুবিধা রয়েছে। একটি হলো রোগীর জন্য সুবিধা, আরেকটি হলো কার্ডিওলজিস্ট, যিনি রিং পরান তার জন্য সুবিধা এবং তৃতীয় হল দেশের জন্য সুবিধা।

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টির সুবিধা হল হার্টের রিং পরানোর জটিল প্রক্রিয়াটি রোবটের মাধ্যমে খুব সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে করা যায়। অনেক সময় হার্টের রিং নিখুঁতভাবে পজিশন করার জন্য এক মিলিমিটার সামনে অথবা এক মিলিমিটার পিছনে নেয়ার প্রয়োজন হয়। হাত দিয়ে করলে নিখুঁতভাবে এই কাজটি করা কঠিন হয়, কিন্তু রোবটের মাধ্যমে নিখুঁতভাবে এটি সম্পন্ন করা যায়।

রোগীদের জন্য আরেকটি সুবিধা হল হৃদরোগ চিকিৎসকগণ সরাসরি এনজিওপ্লাস্টি করতে গেলে যে সময় লাগে, রোবটের মাধ্যমে সেটি করতে অনেক কম সময় লাগে। যে কারণে অল্প সময়ে বেশি রোগীর চিকিৎসা সেবা দেয়া যায়। হার্টের ভিতরে ক্যাথেটার, ওয়্যার (তার), বেলুন, রিং যত কম সময় রাখা যায় রোগীর জন্য তত নিরাপদ। তাই রোবটিক এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে রিং পরাতে সময় কম লাগে বলে জটিলতা ও কম হয়।

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টিতে চিকিৎসকদের জন্য অসুবিধা হল, যেসব চিকিৎসক অনেক এনজিওপ্লাস্টি করেন। একটা সময় এসে তারা দুটি সমস্যায় পড়েন। প্রথমত হল রেডিয়েশনের কারণে অনেক চিকিৎসক ব্রেন ক্যান্সার ও চোখে ক্যাটারাক্ট সহ বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার ঝুঁকিতে পড়েন।

এছাড়া হৃদরোগ চিকিৎসকগণ যখন অপারেশন থিয়েটার বা ক্যাথলেবে কাজ করেন রেডিয়েশন প্রটেকশনের জন্য, তারা ১২ থেকে ১৫ পাউন্ড ওজনের একটি বিশেষ জামা দীর্ঘক্ষণ যাবত পরতে হয়। ফলে ঘাড়ের নার্ভের চাপ পড়ে এবং পরবর্তীতে চিকিৎসক খুব বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ঘাড় ও হাতে ব্যথার কারণে এনজিওপ্লাস্টি করতে পারেন না।

বর্তমানে অনেক সিনিয়র ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজিস্ট এই সমস্যার জন্য চিকিৎসা সেবা দিতে পারছেন না। এক্ষেত্রে রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টির মাধ্যমে রেডিয়েশন ছাড়াই এবং ভারী বিশেষ জামা পড়া ছাড়াই ক্যাথল্যাবের কন্ট্রোলরুমে, তার অফিসে, সুযোগ-সুবিধা থাকলে বাসায় বসে অথবা দেশের বাইরে থেকেও ইন্টারনেটের মাধ্যমে হার্টের রিং পরাতে পারবেন।

দেশের জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা হল অত্যাধুনিক এই চিকিৎসা প্রযুক্তি চালু হলে রোগীকে আর দেশের বাইরে যেতে হবে না। রোবটিক চিকিৎসার জন্য প্রতিবছর অসংখ্য মানুষ ভারত, সিঙ্গাপুর সহ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছেন। আমরা যদি সেবাটি জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরিপূর্ণভাবে চালু করতে পারি, তাহলে খুব কম খরচে রোগীদের এই সেবা দেয়া যাবে। এবং এর মাধ্যমে অনেক বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় ও অনেক বড় অঙ্কের অর্থ দেশে থেকে যাবে।

ডাক্তার প্রদীপ কুমার কর্মকার ভারতের হায়দ্রাবাদের এপোলো হসপিটাল এবং চীনের সাংহাই থেকে রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টে ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। তাছাড়া ডাক্তার প্রদীপ কুমার কর্মকার রোবোটিক এনজিওপ্লাস্টিতে ভারতের প্রখ্যাত চিকিৎসক অধ্যাপক ডাক্তার পিসি রাথের কাছ থেকে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন I

রোবটিক এনজিওপ্লাস্টি চালুর মাধ্যমে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সর্বাধুনিক ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে। বর্তমান মেশিনটি একমাস ব্যবহারের জন্য ফ্রান্স থেকে নিয়ে আসা হয়েছে বাংলাদেশে অবকাঠামো সাথে সহায়ক কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য। একমাস পরে আবার ফেরত চলে যাবে ফ্রান্সে।

যদি রোবটিক সিস্টেমটি বাংলাদেশের অবকাঠামোর সঙ্গে সহায়ক হয়, তাহলে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল এই রোবটিক সিস্টেমটি কেনার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে অনুরোধ করবে। এবং খুব কম খরচে আন্তর্জাতিক সর্বাধুনিক এই প্রযুক্তি সব সময়ের জন্য জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চালু রাখতে পারবে।

R/N

আমাদের তথ্যচিত্র গান কবিতা নাটক ভালো লাগলে ফেসবুকে শেয়ার করুন।
0Shares