স্বাস্থ্য ডেস্ক:
ঠান্ডা বা গরম এবং ঋতু পরিবর্তনের কারণে জ্বর ও সর্দির মতো সমস্যা প্রায় সবারই হয়ে থাকে। সাধারণত ঠান্ডা জ্বর ও সর্দির মতো সমস্যা হলে খুব বেশি গুরুত্ব দেয়া হয় না আমাদের। তবে তিন-চারদিন অতিক্রম করলে বা সমস্যা যখন জটিল হয় তখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া হয়। কেউ কেউ আবার নিজ থেকেই নিকটস্থ ফার্মেসি থেকে ওষুধ সেবন করেন। আবার কেউ ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে থাকেন।
ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা থেকে সুরক্ষায় ভ্যাকসিন নেয়া অবশ্যই কার্যকরী। কিন্তু সেই ভ্যাকসিন সবার নেয়া ঠিক কিনা, এ সম্পর্কে দেশের একটি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেছেন রাজধানীর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদ আরাফাত। এবার তাহলে এই চিকিৎসকের ভাষ্যমতে ফ্লু ভ্যাকসিন নেয়ার ক্ষেত্রে যেসব বিষয় জানা জরুরি, তা জেনে নেয়া যাক।
ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা: ভাইরাসের মাধ্যমে শ্বাসতন্ত্রে হওয়া সংক্রমণকে ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা বলা হয়। আমাদের দেশসহ বিশ্বের সব দেশেই সিজনাল ফ্লু হয়ে থাকে। তবে শীতে ফ্লুর প্রকোপ বৃদ্ধি পায়। প্রতি বছর বিশ্বে ফ্লুর জন্য প্রায় সাড়ে ছয় লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। আর মডারেট, মাইল্ড ও সিভিয়ার মতো ফ্লুতে অসংখ্য মানুষ সংক্রমিত হয়। সাধারণ ফ্লু কোনো ক্ষতির কারণ না হলেও সিভিয়ার ফ্লু থেকে মানুষের মৃত্যু পর্যন্ত হয়ে থাকে বলে জানিয়েছেন ডা. সোহেল মাহমুদ।
লক্ষণ: জ্বর, সর্দি ও নাক বন্ধ হওয়া, নাক দিয়ে পানি পড়া, গলা ব্যথা, শুকনো কাশি, সারা শরীরে ব্যথা, ক্লান্তি ও দুর্বলতা এবং ক্ষুধামন্দা হচ্ছে ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গ। তবে শিশু ও বয়স্ক এবং যাদের কো-মরবিডিটি (পুরনো রোগ) রয়েছে, তাদেরও ইনফ্লুয়েঞ্জার সঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে নিউমোনিয়ার জটিলতা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ অবস্থায় রোগীর কাশির ধরনে পরিবর্তন আসে। অনেক সময় কফ হলুদ বর্ণের হয়।
ঝুঁকিতে কারা: কম-বেশি সবাই ইনফ্লুয়েঞ্জার সংক্রমণ ঝুঁকিতে থাকতে পারে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে মারাত্মক ঝুঁকির কারণ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ফ্লু থেকে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, ৬৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং যাদের জটিল পুরনো রোগ রয়েছে। আবার যাদের হার্ট ফেইলিউর, কিডনি ফেইলিউর, লিভার ডিজিজ, সিভিয়ার ডায়াবেটিস, ক্যানসার বা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে তারা ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জার ঝুঁকিতে থাকতে পারেন।
ইনফ্লুয়েঞ্জা হলে মৃত্যুর ঝুঁকি বেড়ে যায়। এ অবস্থায় সুরক্ষা প্রয়োজন। চিকিৎসকের ভাষ্যমতে, ইনফ্লুয়েঞ্জা হাঁচি-কাশির মাধ্যমে ছড়িয়ে থাকে। শ্বাস-প্রশ্বাসের সঙ্গে ড্রপলেট বাতাসের মাধ্যমেও ছড়ায়। এ কারণে আশপাশে থাকা মানুষও সংক্রমিত হতে পারেন। এ জন্য রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে এবং যাদের ফ্লু রয়েছে তাদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। বিপরীতে যিনি ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জায় সংক্রমিত, তাকে ভ্যাকসিন নিতে হবে।
কারা নেবেন ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন: ফ্লু ভাইরাস থেকে রক্ষার কার্যকর উপায় হচ্ছে ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন নেয়া। বিশ্বজুড়েই ভ্যাকসিনেশনের প্রচলন রয়েছে। আমাদের দেশেও সীমিত আকারে হলেও এই প্রচলন রয়েছে। যাদের ফ্লু থেকে ভয়ানক স্বাস্থ্যঝুঁকি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তারা ভ্যাকসি নিতে পারেন। যদিও আমাদের দেশে এখনো ফ্লু ভ্যাকসিন নেয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো দিক-নির্দেশনা হয়নি বলে জানিয়েছেন ডা. সোহেল মাহমুদ।
এ চিকিৎসক জানান, উন্নত বিশ্বে গাইডলাইন মেনে তবেই ভ্যাকসিন নেয়া হয়। যেমন, ৬ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুকে ভ্যাকসিন দেয়া যাবে। আবার যাদের বয়স ৬৫-এর বেশি, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং যাদের গুরুত্বর স্বাস্থ্যগত সমস্যা রয়েছে, তাদের ভ্যাকসিনেশনের আওতায় নেয়া উচিত। এছাড়া চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসা সহকারী, হেলথকেয়ার ওয়ার্কারসহ যারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকেন, তাদেরও ভ্যাকসিন নেয়ার সুপারিশ করা হয়।
কারা ভ্যাকসিন নিতে পারবেন না: ৬ মাসের কম বয়সী শিশু এবং ভ্যাকসিনে যাদের অ্যালার্জি রয়েছে ও ভ্যাকসিন নেয়ার পর যাদের অ্যালার্জি হয়েছে, তাদের ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন দেয়া যাবে না।
ভ্যাকসিন কেন নেবেন: ফ্লু ভ্যাকসিন একবার দিলেই হয় না। নির্দিষ্ট মেয়াদে এক বছর পর পর নিতে হয় ফ্লু ভ্যাকসিন। আর সিঙ্গেল ডোজের ভ্যাকসিন এক বছরের জন্য কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
খরচ কেমন: এ ধরনের ভ্যাকসিন দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা হয়। আবার দেশীয় কিছু ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানি তৈরি করে থাকে ফ্লু ভ্যাকসিন। বড় বড় ফার্মেসি, হাসপাতাল ও ভ্যাকসিন সেন্টারে পাওয়া যায় ফ্লু ভ্যাকসিনগুলো। এসবের দাম প্রায় এক হাজার টাকা। তবে বিদেশ থেকে আমদানি করা ভ্যাকসিনের দাম কিছুটা বেশি। আর ভ্যাকসিন নেয়ার আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরমর্শ অনুসরণ করতে হবে।
R/N