একের পর এক ডাকাতি-ছিনতাই-চুরি

প্রকাশিত: 11:22 PM, June 5, 2026

একের পর এক ডাকাতি-ছিনতাই-চুরি

নোভা মিডিয়া সিলেট ডেস্ক:

সিলেট মহানগরীতে সাম্প্রতিক সময়ে চুরি, ছিনতাই ও ডাকাতিসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একের পর এক প্রকাশ্য ছিনতাই এবং বাসাবাড়িতে চুরির ঘটনায় নগরবাসীর মনে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ নাগরিক ও বিশিষ্টজনদের অভিযোগ, মহানগর পুলিশের (এসএমপি) শীর্ষ কর্মকর্তাদের উদাসীনতা এবং কিছু কথিত ‘সাংবাদিক’ নামধারী সোর্সের আশকারায় অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। তবে পুলিশ প্রশাসনের দাবি, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নগরীর সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো রয়েছে।

সম্প্রতি নগরের আম্বরখানা মোড় থেকে তিন বছরের সন্তানসহ শাহী ঈদগাহ যাচ্ছিলেন বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক অহী আলম রেজা। সিএনজিচালিত অটোরিকশায় যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা ধারালো ছুরি বের করে তাঁর অবুজ শিশুকে আঘাত করার ভয় দেখায়। সন্তানের জীবন রক্ষার্থে তিনি সঙ্গে থাকা ২১ হাজার টাকা ছিনতাইকারীদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন। এই ঘটনায় বিমানবন্দর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুরাহা মেলেনি।

এর আগে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দুপুরে হাউজিং এস্টেট এলাকায় এক নারীর রিকশা গতিরোধ করে প্রকাশ্য দিবালোকে মোটরবাইক আরোহী ছিনতাইকারীরা ব্যাগ টেনে নিয়ে যায়। ঘটনার একটি সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। এছাড়া, গত ৫ মার্চ সাগরদিঘীরপার এলাকায় এক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ব্যাগ ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কেবল মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতির টাকা ডাকাতি কিংবা গণমাধ্যমকর্মীদের বাসায় চুরির মতো বড় ঘটনাগুলোই সামনে আসছে। লোকলজ্জা এবং আইনি জটিলতার ভয়ে অনেক ভুক্তভোগীই থানা বা হাসপাতাল পর্যন্ত যান না, যার ফলে বহু অপরাধ অন্তরালেই থেকে যাচ্ছে। এসএমপির মিডিয়া শাখা ও মামলার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নগরীতে অপরাধের গ্রাফ মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত ১৩ মাসে সিলেট মহানগরীতে ২৫টি হত্যাকাণ্ড, ৫৬টি ধর্ষণ, ৫১টি ছিনতাই এবং ১৫০টি চুরির মামলা রেকর্ড করা হয়। এর মধ্যে কেবল ২০২৫ সালের জুলাই মাসেই ৯টি অপহরণ, ৪৩টি চুরি ও ৭টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত এক বছরে চুরির ঘটনায় ১৪৫টি এবং দস্যুতা বা ছিনতাইয়ের ঘটনায় ১৮টি মামলা হয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি মাসেই গড়ে একাধিক বড় ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটছে।

পুলিশের তথ্যমতে, বিগত সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত ২৪ জন ডাকাত, ১৫৭ জন ছিনতাইকারী এবং ২৩১ জন চোরকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়া গত ১০ বছরের অপরাধের ইতিহাস পর্যালোচনা করে ২৬৩ জন ছিনতাইকারীর একটি তালিকা তৈরি করে ৪৭ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের দাবি, এই গ্রেপ্তার অভিযান অপরাধের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং মূল হোতারা এখনো অধরাই রয়ে গেছে।

সিলেটের নাগরিক আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এমাদ উল্লাহ শহীদুল ইসলাম বলেন, “সিলেটে পরপর কতগুলো ছিনতাই ও চুরির ঘটনা ঘটলো, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিগত সময়ের তুলনায় সম্প্রতি অপরাধের মাত্রা অনেক বেড়েছে এবং নগরবাসী এখন নিজেদের নিরাপদ বোধ করছেন না।”

নগরীর এই চরম আইনশৃঙ্খলার অবনতির জন্য অনেকেই বর্তমান পুলিশ কমিশনার আবদুল কুদ্দুছ চৌধুরীকে দায়ী করছেন। অভিযোগ উঠেছে, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই অপরাধের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে পুলিশের কিছু বিতর্কিত সোর্স ও স্বার্থান্বেষী মহলের সাথে প্রশাসনের সখ্যতার কারণেই অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে।

নগরীর এমন পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে পুলিশকে দ্রুত কার্যকর ও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রেজাউল হাসান কয়েস লোদীসহ স্থানীয় শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ।

আমাদের তথ্যচিত্র গান কবিতা নাটক ভালো লাগলে ফেসবুকে শেয়ার করুন।
0Shares