স্টাফ রিপোর্টার:
সিলেট বিভাগে হামের ভয়াবহ প্রকোপ উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। দিন দিন আক্রান্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর মিছিল। চলতি বছরের গত আট মাসে বিভাগজুড়ে হাম আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় এক হাজারে পৌঁছেছে। বিশেষ করে গত দুই সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই কারও না কারও মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে টিকাদান কর্মসূচি সফল হওয়ার দাবি থাকলেও হঠাৎ করে কেন এভাবে হামজনিত মৃত্যু বাড়ছে, তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা এখনো মেলেনি।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৯৮৮ জন নিশ্চিত হামরোগী শনাক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৩৫৭ জন সুনামগঞ্জে এবং ৩২০ জন সিলেট জেলায় আক্রান্ত হয়েছেন। এছাড়া মৌলভীবাজারে ১৫৮ জন ও হবিগঞ্জে ১৫৩ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যার মধ্যে দুজন রুবেলায় আক্রান্ত ছিলেন।
গতকাল পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১০ জনের ক্ষেত্রে ল্যাব পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছিল। বাকি ব্যক্তিরা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। মৃতদের মধ্যে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক এবং একজন নার্সও রয়েছেন। বর্তমানে বিভাগের বিভিন্ন হাসপাতালে ৩১৭ জন সন্দেহজনক রোগী চিকিৎসাধীন আছেন।
সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতাল ও এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি রোগী ভর্তি রয়েছেন। বিশেষ করে শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (পিআইসিইউ)-এর সব শয্যা পূর্ণ রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অনেক অভিভাবক প্রথমে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা করান এবং রোগীর অবস্থা সংকটজনক হয়ে পড়লে সরকারি হাসপাতালে নিয়ে আসেন। এতে চিকিৎসকদের জন্য রোগীকে বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. মিজানুর রহমান বলেন, “রোগীকে অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় আনা হলে তাৎক্ষণিকভাবে সুস্থ করা কঠিন হয়ে যায়। উপসর্গ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে আনলে সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে।” তিনি জানান, এবার শুধু শিশু নয়, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। তাঁর হাসপাতালেই ১৭ জন প্রাপ্তবয়স্ক হাম রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।
হামের ভয়াবহ বিস্তারের পেছনে সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো নিশ্চিত করতে পারেননি স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা। বিভাগীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. মাহবুবুল আলম বলেন, নতুন কোনো ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, যেসব শিশু এখনো টিকার আওতায় আসেনি বা কোনো কারণে টিকা পায়নি, তারাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। পাশাপাশি শিশুদের অপুষ্টিজনিত সমস্যাও মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
অন্যদিকে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদ হোসেন জানান, নগর এলাকায় টিকাদান কর্মসূচি সফল হওয়ায় পরিস্থিতি তুলনামূলক নিয়ন্ত্রণে থাকলেও সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, সংক্রমণ রোধে মাঠপর্যায়ে নজরদারি ও সচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগকে আরও সতর্ক হয়ে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করার পাশাপাশি দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ও সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করতে না পারলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।