, ,

প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের নিয়ে চিন্তায় বিএনপি

শিউলী
প্রকাশিত October 28, 2026, 12:03 PM
প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের নিয়ে চিন্তায় বিএনপি

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যোগ্যতা, জনসম্পৃক্ততা এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতার ভিত্তিতে একক প্রার্থী বাছাই করতে চায় ক্ষমতাসীন বিএনপি। এই লক্ষ্যে দলীয় প্রধান তারেক রহমানের নির্দেশনায় সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শুরু হয়েছে। তবে প্রার্থী বাছাইয়ের এই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব নিয়ে দলের ভেতরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, কোথাও কোথাও জরিপ ও আলোচনা চলার মধ্যেই নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের সামনে আনার চেষ্টা করছেন সংসদ সদস্যরা। এতে দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

দলীয় সূত্র বলছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে একাধিক জরিপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী, প্রার্থী বাছাইয়ের সুপারিশ প্রথমে উপজেলা কমিটি থেকে জেলা কমিটিতে যাবে। জেলা কমিটি যাচাই-বাছাই করে তা পাঠাবে বিভাগীয় টিমের কাছে। কোনো পর্যায়ে অনিয়ম বা অসংগতি দেখা দিলে তা পর্যালোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনে কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। নির্বাচন পরিচালনা এবং প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে তারেক রহমানের নির্দেশনায় চার সদস্যের একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

পরিকল্পিত এই প্রার্থী বাছাই প্রক্রিয়ায় স্থানীয় সংসদ সদস্যদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ সামনে আসায় বিএনপির মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। দলের একাধিক দায়িত্বশীল নেতার ভাষ্য, সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে চালানো জরিপের ক্ষেত্রে কোনো কোনো এমপি নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের পক্ষে প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিষয়ে নিজেদের পছন্দ-অপছন্দের হিসাব মেলাতে শুরু করেছেন তাঁরা। কয়েকজন এমপির বিরুদ্ধে সম্প্রতি শারদীয় দুর্গাপূজার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গিয়ে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

বিএনপির নেতাদের একটি অংশ বলছে, একক প্রার্থী নির্ধারণের ক্ষেত্রে এমপিদের প্রভাবের বাইরে থেকে প্রার্থী বাছাইয়ের পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে জনসমর্থন এবং স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতার পরিবর্তে ব্যক্তিগত পছন্দ প্রাধান্য পেতে পারে। এতে যোগ্য প্রার্থীদের বাদ পড়ার পাশাপাশি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে একাধিক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।

তবে দলটির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ এখনো আলোচনার পর্যায়েই রয়েছে। যাচাই-বাছাই এবং সমন্বয়ের মাধ্যমে একজনকে চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে। তাঁদের মতে, প্রার্থী হতে আগ্রহী একাধিক ব্যক্তি থাকলেও শেষ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য একজনকে সমর্থন দেওয়াই দলের লক্ষ্য।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতার মতে, জরিপের মাধ্যমে প্রার্থী বাছাইয়ের উদ্যোগ থাকলেও তা প্রভাবমুক্ত না হলে মনোনয়নে স্থানীয় জনসমর্থনের যথাযথ প্রতিফলন না-ও ঘটতে পারে। সংসদ সদস্যরা নিজেদের পছন্দের বাইরের কাউকে সমর্থন না দিলে একক প্রার্থী নির্ধারণে জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের মতামত একেবারে উপেক্ষা করার পক্ষেও নন তাঁরা। এই নেতাদের বক্তব্য, স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এলাকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ভোটারদের মনোভাব এবং সম্ভাব্য প্রার্থীদের সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারেন। তাঁদের অভিমতের পাশাপাশি প্রার্থীর অতীত কর্মকাণ্ড, ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি, সাংগঠনিক দক্ষতা, এলাকায় জনসম্পৃক্ততা এবং নির্বাচনী লড়াইয়ের সক্ষমতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এ বিষয়ে বলেন, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তা যাচাই করে প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ চলছে। বিএনপি একক প্রার্থীই দেবে এবং তা নিশ্চিত করতে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

প্রার্থী বাছাইয়ে এমপিদের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ প্রসঙ্গে প্রিন্স বলেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়নে আমরা মতামত নিচ্ছি। সেখানে ৮ জন, কোথাও ৬ জন বেরিয়ে আসছেন (সম্ভাব্য প্রার্থী)। আলোচনার মাধ্যমে ওই সংখ্যা দুই-তিনে নেমে এসেছে। তাঁদের মধ্য থেকে গ্রহণযোগ্যদের সমর্থন দেওয়া হবে। এই অবস্থায় কে অধিক গ্রহণযোগ্য, সেটা তো বোঝাই যাচ্ছে। তাঁকে নিয়ে যদি আমরা ঘুরি বা কথা বলি, নির্বাচনের আগে তো এ রকম হতেই পারে।’

অন্যদিকে, বিএনপির সংসদ সদস্যরা দলীয় প্রধানের নির্দেশনা অনুসারেই কাজ করার দাবি করছেন। সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘স্থানীয় নির্বাচনের প্রার্থী বাছাইয়ে দলের চেয়ারম্যান একটা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। সে অনুযায়ী আমরা কাজ করছি। প্রার্থী হতে অনেকে চাইবেন, তবে সবাই তো মনোনয়ন পাবেন না।’

স্থানীয় পর্যায়ে একক প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ কঠিন হলেও তা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) বিলকিস জাহান শিরীন। তিনি বলেন, ‘আমরা তো চেষ্টা করেই যাব। দল যারা করে, দলের সিদ্ধান্ত তাঁদের মানতে হবে।’

বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খানও গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থী বাছাইয়ের বিষয়ে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমি যতটুকু জানি, গ্রহণযোগ্য একক প্রার্থী বাছাইয়ে দলীয় প্রধান এবং দলের চেষ্টা ও নির্দেশনা—দুই-ই আছে। আমি বিশ্বাস করি, দল অবশ্যই এটা করতে পারবে।’