, ,

বিশ্বজুড়ে ডিজেলের সংকটের দ্রুত সমাধান নেই

শিউলী
প্রকাশিত October 26, 2026, 08:58 PM
বিশ্বজুড়ে ডিজেলের সংকটের দ্রুত সমাধান নেই

বিশ্বজুড়ে ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনকে ঘিরে দুটি বড় যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অপরিশোধিত তেলের পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও তা থেকে ডিজেল উৎপাদন ও সরবরাহের সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সংকট আরও গভীর হচ্ছে। নতুন শোধনাগার নির্মাণে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে। তাই দ্রুত সংকট মোকাবিলায় জ্বালানির চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

বছরের শুরুতেই ডিজেল সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। ইউরোপে ২০০৯ সালের পর থেকে প্রায় ১০০টি চালু শোধনাগারের মধ্যে ৩০ থেকে ৩২টি বন্ধ হয়ে গেছে। অস্ট্রেলিয়ায় চলতি শতকে আটটির মধ্যে ছয়টি শোধনাগার বন্ধ হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে উচ্চ জ্বালানি ব্যয়, অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা হ্রাস এবং মধ্যপ্রাচ্য, নাইজেরিয়া, চীন ও ভারতের আধুনিক শোধনাগারগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াকে দায়ী করা হচ্ছে।

এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছে উপসাগরীয় অঞ্চলের যুদ্ধ। সৌদি আরব, ওমান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন ও কুয়েতের বেশ কয়েকটি আধুনিক শোধনাগারে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধার কারণে ডিজেল ও উড়োজাহাজের জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। সৌদি আরবের জাজান শোধনাগার বন্ধ রয়েছে। বাহরাইনের বাপকো শোধনাগার চালু হলেও উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৭৫ শতাংশে সীমাবদ্ধ রয়েছে।

সোমবার (২৬ অক্টোবর) মধ্যপ্রাচ্যের সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল জানায়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শোধনাগারগুলো কয়েক মাস ধরে সর্বোচ্চ সক্ষমতায় উৎপাদন করছে। কিন্তু দীর্ঘদিন এভাবে চালালে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি যান্ত্রিক ত্রুটির ঝুঁকিও বাড়বে। ভারত চলতি মাসে দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল ডিজেল রপ্তানি করেছে, যা যুদ্ধ শুরুর পর সর্বোচ্চ। তবে দেশটির পক্ষে রপ্তানি আরও বাড়ানো কঠিন হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের গড় দাম বছরের শুরুতে প্রতি গ্যালন ৩ ডলার ৪৮ সেন্ট থাকলেও সংকটের প্রভাবে তা বেড়ে ৬ ডলার ১৮ সেন্ট হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম জানুয়ারির ২ দশমিক ৫৫ দিরহাম থেকে বেড়ে চলতি মাসে ৪ দশমিক ৮০ দিরহামে দাঁড়িয়েছে।

রাশিয়ার ডিজেলেও মিলছে না সমাধান

ইউক্রেনের ধারাবাহিক ড্রোন হামলায় রাশিয়ার শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগে রাশিয়া দৈনিক প্রায় ১০ লাখ ব্যারেল পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানি করত। এখন তা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে এসেছে। বিকল্প হিসেবে দেশটি বেলারুশের সহায়তা নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার কাছ থেকে ২২ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল ডিজেল আমদানির জন্য নিষেধাজ্ঞায় ছাড় দিয়েছে। তবে এটি বৈশ্বিক ডিজেলঘাটতির মাত্র প্রায় ৭ শতাংশ পূরণ করতে পারে। ফলে রাশিয়ার সরবরাহ দিয়ে সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চীনের কাছ থেকেও বাড়তি সরবরাহ পাওয়ার আশা পূরণ হয়নি। বরং দেশটি জ্বালানি রপ্তানি বন্ধের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন শোধনাগার ও পাইপলাইন প্রকল্পে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো দ্রুত সংকট মোকাবিলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারবে না।

সমাধান হতে পারে জ্বালানির ব্যবহার কমানো

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজেলের চাহিদা কমাতে পরিবহন খাতে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। বৈদ্যুতিক ট্রেন, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের প্রসার ঘটানো গেলে ডিজেলের ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি ভবনের তাপ নিরোধকব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ ও সৌর তাপপ্রযুক্তি ব্যবহার করে জ্বালানি তেলের চাহিদা কমানো সম্ভব।

খনি, নির্মাণকাজ, টেলিযোগাযোগ টাওয়ার ও বিদ্যুৎ-সংযোগবিহীন পর্যটন এলাকায় ব্যবহৃত ডিজেল জেনারেটরের পরিবর্তে সৌর প্যানেল ও ব্যাটারি ব্যবহার করা যেতে পারে।

এসব উদ্যোগ তাৎক্ষণিক সমাধান না দিলেও নতুন শোধনাগার বা পাইপলাইন নির্মাণের তুলনায় দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধের কারণে সরবরাহ বাড়ানোর সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। তাই বিশ্বকে এখন শুধু নতুন জ্বালানির উৎস খোঁজার পরিবর্তে যেখানে সম্ভব ডিজেলের ব্যবহার কমানোর কৌশল নিতে হবে।