একদিকে বিশাল বাজেটের ক্রেজ, অন্যদিকে ফুটবল উন্মাদনা

প্রকাশিত: 6:39 PM, June 11, 2026

একদিকে বিশাল বাজেটের ক্রেজ, অন্যদিকে ফুটবল উন্মাদনা

বৃহস্পতিবার (১১ জুন, ২০২৬)। ঠিক বিকাল ৩টায় জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বাজেট পেশ করতে যাচ্ছেন।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারের পটভূমিতে প্রণীত এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং প্রবৃদ্ধির গতি ত্বরান্বিত করা। বাজেট পেশের ঐতিহাসিক এই মুহূর্তটি উপলক্ষে অর্থমন্ত্রী কী রঙের পোশাক পরবেন কিংবা তার ঐতিহ্যবাহী ব্রিফকেসে কী থাকছে—তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের আগ্রহের কমতি নেই।

তবে এই দিনে বাংলাদেশিদের মনে শুধু বাজেটের হিসাব-নিকাশই নয়, দোলা দিচ্ছে অন্য এক রোমাঞ্চ। শত শত মাইল দূরে আজ থেকেই বসছে ফিফা আয়োজিত ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে এবারের আসরে অংশ নিচ্ছে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, জার্মানি, ফ্রান্সসহ সর্বমোট ৪৮টি দেশ। বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় (অর্থাৎ, শুক্রবার প্রথম প্রহরে) মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে বিশ্ব ফুটবলের এই মহাযজ্ঞ।

এই খেলা নিয়ে দেশের ছোট-বড় সবার মধ্যেই উত্তেজনা কাজ করছে। ফুটবল তারকা মেসি ও রোনালদোর এটাই শেষ আসর। ইতোমধ্যে দেশের মার্কেটগুলোতে প্রিয় দলগুলোর জার্সি ও পতাকা বিক্রির ধুম পড়েছে। অন্যদিকে, খেলা সরাসরি সম্প্রচারের জন্য দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল কোটি কোটি টাকা খরচ করে মিডিয়া স্বত্ব কিনেছে। পিছিয়ে নেই রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশনও (বিটিভি); বিশ্বকাপ সম্প্রচারের মিডিয়া স্বত্ব কিনতে চলতি অর্থবছরের বরাদ্দ থেকে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭২ কোটি টাকা।

এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, আসন্ন অর্থবছরে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্রে বিশাল আশাবাদ থাকবে। বাজেট বৃদ্ধির এই ধারাবাহিক প্রবণতাকে অনেক অর্থনীতি বিশ্লেষক ‘রাজনৈতিক ক্রেজ’ বলে অভিহিত করলেও বিগত বছরগুলোতে পূর্বসূরীরাও একই পথে হেঁটেছেন।

২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিএনপি সরকারের মোট ব্যয়ের বাজেট নির্ধারণ করা হচ্ছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই ব্যয় ছিল ৭ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ব্যয়ের পরিধি বাড়ছে ১ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটে পরিচালন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৫ হাজার ৭৪০ কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৫ লাখ ৬৭ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা) চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশই চলে যাবে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধে। শুধু সুদ মেটাতেই ব্যয় হবে ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা; যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ সুদ ১ লাখ ৫ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক সুদ ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।

উন্নয়ন ব্যয়: দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের গতি সচল রাখতে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিসহ (এডিপি) মোট উন্নয়ন ব্যয় ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ১৬ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে এই বরাদ্দ কমিয়ে ২ লাখ ১৪ হাজার ৮৬২ কোটি টাকায় নামানো হয়েছিল। ফলে নতুন বাজেটে উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ এক ধাক্কায় প্রায় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার মধ্যে মূল এডিপির আকার ৩ লাখ কোটি টাকা।

নতুন বাজেটে মোট রাজস্ব ও বৈদেশিক অনুদান মিলিয়ে প্রাপ্তির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৭ লাখ ১ হাজার ১৫০ কোটি টাকা। এটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার (৫ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা) চেয়ে প্রায় ১৮.২৩ শতাংশ বেশি।

রাজস্ব আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে ‘এনবিআর কর রাজস্ব’ বাবদ লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি বছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা থেকে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বেশি। এছাড়া নন-এনবিআর কর রাজস্ব ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর-ব্যতীত রাজস্ব ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধরা হচ্ছে। বৈদেশিক অনুদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।

ব্যয়ের তুলনায় আয় কম হওয়ায় বরাবরের মতোই নতুন বাজেটে বড় অঙ্কের ঘাটতি থাকছে। অনুদানসহ সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি দাঁড়াতে পারে ২ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩.৫ শতাংশ (অনুদান ব্যতীত ঘাটতি ৩.৬ শতাংশ বা ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা)।

এই বিশাল ঘাটতি মেটাতে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় উৎসের ওপরই নির্ভর করতে হবে।

বৈদেশিক উৎস (নিট ঋণ): ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। মোট বৈদেশিক ঋণ পাওয়ার লক্ষ্য ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং ঋণ পরিশোধে ব্যয় হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা।

ব্যাংকিং ব্যবস্থা (অভ্যন্তরীণ নিট ঋণ): ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা (এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা এবং স্বল্পমেয়াদি ঋণ সমন্বয় ৬ হাজার কোটি টাকা)।

ব্যাংক-বহির্ভূত উৎস: সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে নিট ১৫ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে, যা গত অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা (১৯ হাজার কোটি টাকা) থেকে কম।

নতুন অর্থবছরের জন্য প্রাক্কলিত জিডিপির আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরের সাময়িক বা প্রোভিশনাল জিডিপি ছিল ৬০ লাখ ৮০ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বিশাল এই জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে দেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পোৎপাদন ব্যাপক হারে বাড়াতে হবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এই বিশাল বাজেট সময়োপযোগী হলেও এটি বাস্তবায়ন করা নতুন সরকারের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। বিশেষ করে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বৃদ্ধি করা এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বিপুল বরাদ্দ দেওয়া বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এছাড়া ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা যেন বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহকে সংকুচিত না করে, বাজেট চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে সেদিকে কড়া নজর রাখার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আমাদের তথ্যচিত্র গান কবিতা নাটক ভালো লাগলে ফেসবুকে শেয়ার করুন।
0Shares