রাজনৈতিক হাওয়া থেকে বিচারপতিদের মুক্ত থাকার নির্দেশ প্রধান বিচারপতির

প্রকাশিত: 11:28 AM, August 31, 2023

রাজনৈতিক হাওয়া থেকে বিচারপতিদের মুক্ত থাকার নির্দেশ প্রধান বিচারপতির

জাতীয় ডেস্ক :
# প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন ২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর।

# জন্ম ১৯৫৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায়।

# ১৯৮১ সালে আইন পেশায় যোগ দেন।

# ১৯৮৩ সালে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

বিচারপতিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা থেকে মুক্ত থেকে বিবেকের প্রতি অনুগত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন বিদায়ী প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

বৃহস্পতিবার বিচারিক কর্মজীবনের শেষ দিন বিদায় অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

৬৭ বছর বয়স পূর্ণ করে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর অবসরে যাচ্ছেন প্রধান বিচারপতি। সে সময় সুপ্রিম কোর্ট অবকাশে থাকবে বলে বৃহস্পতিবারই তার বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবস।

রেওয়াজ অনুসারে এদিন তাকে আপিল বিভাগের এক নম্বর বিচার কক্ষে বিদায় সংবর্ধনা দেয় অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি।

বিদায়ী ভাষণে হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বিচারপতিদের উদ্দেশে বলেন, রাজনৈতিকভাবে বয়ে যাওয়া হাওয়া থেকে নিজেদের মুক্ত রেখে, সংবিধান, আইন নিজেদের বিচারিক বিবেকের প্রতি পরিপূর্ণ অনুগত থেকে বিচার কার্য সমাধান করতে হবে।

বিদায়ী বক্তব্যে তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক বিভক্তি বিচারলয়ে আসলে তা মঙ্গলজনক নয়।

হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, বিচার বিভাগ প্রজাতন্ত্রের হৃদপিণ্ড। রাষ্ট্রের বিচার বিভাগের দক্ষতার চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আর কোনো উপযুক্ত পরীক্ষা নেই। একটি জাতির জনগণ শাসন বিভাগ বা আইন বিভাগের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলতে পারে, কিন্তু বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা হারালে সে জাতিকে খারাপ দিনটির জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

প্রধান বিচারপতি বলেন, আইনের নিরঙ্কুশ আধিপত্য বা প্রাধান্য কার্যকর করার দায়িত্ব বিচার বিভাগের। বিচার বিভাগ যদি আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ করতে ব্যর্থ বা পিছপা হয় তাহলে রাষ্ট্র এবং নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হতে বাধ্য।

বিচারালয়ে আইনজীবীদের বিভক্তি ও মতভেদ আইনের শাসনের পথকে রুদ্ধ করে বলে সতর্ক করেন তিনি।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করলে এবং বিচারালয়কে নিরাপদ দূরত্বে রাখলে বিচার বিভাগ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। রাজনৈতিক বিভক্তি রাজপথ অতিক্রম করে বিচারালয় অভিমুখে ধাবিত হলে সেটা বিচারলয়ের জন্য মঙ্গলজনক হয় না। আমাদের মনে রাখতে হবে, আইনজীবীদের বিভক্তি ও মতভেদ এবং তার প্রতিক্রিয়া বিচারালয়কে ক্ষতিগ্রস্থ করে। রাজনৈতিক মতাদর্শ রাজনৈতিকভাবে বাস্তবায়ন করলে এবং বিচারলয়কে নিরাপদ দুরত্বে রাখলে বিচার বিভাগ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘যে মহান চিন্তা ও কল্যাণ চেতনাকে সন্নিবেশিত করে আমাদের সংবিধান প্রণীত হয়েছে, তার ধারক ও বাহক হিসেবে, দেশের সকল আইন ও সকল আইনগত কার্যক্রম সাংবিধানিক চেতনার প্রতিফলন নিশ্চিত করার সুমহান জাতীয় দায়িত্ব আমাদের সবার।’

সর্বোচ্চ আদালতে শুনানি-রায়-আদেশে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ছেসর্বোচ্চ আদালতে শুনানি-রায়-আদেশে বাংলা ভাষার চর্চা বাড়ছে
প্রধান বিচারপতির শেষ বিচারিক কর্মদিবস প্রধান বিচারপতির শেষ বিচারিক কর্মদিবস
কনিষ্ঠ আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘তোমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার মতো পরিশ্রমী ও শক্তিশালী হও, কিন্তু ভদ্রতাকে বিসর্জন দিয়ে নয়, দয়ালু হও, কিন্তু দুর্বল নয়; সাহসী হও কিন্তু আদালতকে ধমকাবে নাভ চিন্তাশীল হও কিন্তু অলস হয়ো নাভ নম্র হও কিন্তু ভীরু হয়ো না। গর্বিত হও কিন্তু অহংকারী নয়। হাস্যরসিক হও কিন্তু মূর্খতা ছাড়া; সৎ থাকো, পরিশ্রম করো, একদিন দেখবে অনেক বড় আইনজীবী হয়ে গিয়েছ।’

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘সে স্বাধীনতা কার্যকর করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের প্রতিটি অঙ্গের এবং প্রতিটি নাগরিকের। সে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে একাত্তরের রক্ত বৃথা যাবে।’

শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য শক্তিশালী ও স্বাধীন বিচার বিভাগ অপরিহার্য উল্লেখ করে হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী বলেন, ‘গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো আইনের শাসন এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় জনগণের অগাধ আস্থা স্থাপন করতে হবে এবং থাকতে হবে; নইলে জনগণের অধিকার রক্ষা হবে না এবং স্বাধীনতাও বিপন্ন হবে।’

প্রতিটি আইনে ‘মানবিকতার স্পর্শ’ থাকতে হবে মন্তব্য করে প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আইন যদি দরিদ্রকে পিষে দেয় আর ধনী ব্যক্তি যদি আইনকে পিষে দেয়, তাহলে রাষ্ট্র এবং বিচার বিভাগ সঠিকভাবে চলছে এটা কোনভাবেই বলা যাবে না।’

অ্যাটর্নি জেনারেল এবং আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের পবিত্র দায়িত্ব হলো সংবিধানের প্রতিটি অক্ষরের প্রতি অনুগত থাকা এবং সঠিক ব্যাখ্যা দেয়া।’

বাংলাদেশকে বসবাসের জন্য ‘আরো ভালো জায়গা করার লক্ষ্যে’, জনগণ যাতে স্বল্প খরচে স্বল্প সময়ে ‘ন্যায়বিচার’ পায় তার জন্য বিচারকদের উদ্ধুদ্ধ করার জন্য সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন বলেও জানান হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

তিনি বলেন, ‘চেষ্টা করেছি বিচারপ্রার্থী অভাগা মানুষগুলো আদালত প্রাঙ্গণে এসে একটু স্বস্তিতে বসতে পারে তার ব্যবস্থা করতে।

বিচারক এবং আইনজীবীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আমার কাছে মনে হচ্ছে আমি আমার বিচার বিভাগ তার কাছেই হস্তান্তর করতে যাচ্ছি যিনি এই বিভাগকে আরও গতিশীল করার জন্য ক্ষমতাবান এবং মনোযোগী হবেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘জুডিসিয়ারীকে পরিবর্তন করার জন্য জনসাধারণের চাহিদা এবং তাদের ক্রমবর্ধমান অনুভূতি এবং সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টার আকাঙ্ক্ষা কাজ করেছে আমার নিজের ভিতর। হয়তো আমি নাড়া দিতে পেরেছি মাত্র। আমার পদক্ষেপগুলো তাদের সমাধানের পথের নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে কিন্তু সম্পূর্ণ সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার নিয়ামক শক্তিগুলোর একই মন-মানসিকতা এবং সমন্বিত উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় অর্থের যোগান আর সমাজ ব্যবস্থা, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্নীতিমুক্ত করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা এবং পদক্ষেপ।

বিচার বিভাগ, প্রধান বিচারপতি, হাইকোর্ট, সুপ্রিম কোর্ট, আইনজীবী
২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছ থেকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
২০২১ সালের ৩১ ডিসেম্বর বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের কাছ থেকে দেশের ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।

১৯৫৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ায় বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর জন্ম। পড়ালেখা শেষ করে ১৯৮১ সালের ২১ অগাস্ট তিনি ঢাকা জজ কোর্টে আইনজীবী হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়ে আইন পেশায় যোগ দেন।

১৯৮৩ সালে হাই কোর্ট বিভাগে এবং ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন তিনি।

হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, খুলনা সিটি করপোরেশন, কুষ্টিয়া পৌরসভা, জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির আইন উপদেষ্টা ছিলেন। বাংলাদেশের অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেলের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি।

২০০৯ সালের ২৫ মার্চ হাই কোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। ২০১৩ সালের ৩১ মার্চ আপিল বিভাগের বিচারক হন।

তিনি ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

সংবিধানের ৯৬ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতিসহ সুপ্রিম কোর্টের বিচারকরা ৬৭ বছর পর্যন্ত পদে থাকতে পারেন।

বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর বড় ভাই আবু বকর সিদ্দিকীও এক সময় আপিল বিভাগের বিচারক ছিলেন।

R/N

আমাদের তথ্যচিত্র গান কবিতা নাটক ভালো লাগলে ফেসবুকে শেয়ার করুন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

0Shares