অরাজনৈতিক দল হলেও রাজনীতিতে সক্রিয় হেফাজতের ৩০ নেতা

প্রকাশিত: 7:13 AM, September 2, 2023

অরাজনৈতিক দল হলেও রাজনীতিতে সক্রিয় হেফাজতের ৩০ নেতা

জাতীয় ডেস্ক :

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন হেফাজতে ইসলামের অন্তত ৩০ কেন্দ্রীয় নেতা। নিবন্ধিত ইসলামপন্থি দলের অধীনে তারা বিভিন্ন আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তাই ভোটের আগে জোটের দিকে এখন গভীর মনোযোগ তাদের। সে জন্য সংগঠনটিকে এখন পুনর্গঠনও করতে চান তারা। সরকারবিরোধী অবস্থানে গিয়ে মনোনয়ন পেতে সুবিধা হবে বলে মনে করছেন মনোনয়নপ্রত্যাশীরা।

এর আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও এমন অবস্থা তৈরি করে বিভিন্ন দলের হয়ে নির্বাচন করেছেন সংগঠনটির অনেক নেতা। তবে সরাসরি হেফাজতে ইসলামের ব্যানারে নির্বাচন করবেন না কেউ। কারণ হেফাজত নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করে।

গত নির্বাচনে হেফাজত নেতারা নেজামে ইসলাম, জমিয়াত উলেমা-ই-ইসলাম, খেলাফত আন্দোলন, খেলাফত মজলিস (ইসহাক), খেলাফত মজলিস (হাবিবুর রহমান), খেলাফতে ইসলামী এবং ইসলামী ঐক্যজোটের দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হন।

তবে নিজেদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাবি করলেও মূলত রাজনৈতিক দলকে নিয়েই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠিত।

এ বিষয়ে হেফাজতে ইসলামের আমির মহিবুল্লাহ বাবুনগরী এক সময় বলেছিলেন, ‘হেফাজতে ইসলাম একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এখান থেকে কারও নির্বাচন করার সুযোগ নেই। অন্য ইসলামী দলের ব্যানারে গিয়ে কোনো হেফাজত নেতা নির্বাচন করতে চাইলে তা তার ব্যাপার। আমরা ভোটের মাঠে কাউকে সমর্থন দিই না। তাই তাদের হেফাজতের প্রার্থী বলা যাবে না।’

হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দিন রাব্বানী বলেন, ‘হেফাজতে বিভিন্ন ইসলামী দলের নেতারা রয়েছেন। সরাসরি হেফাজতের ব্যানারে নির্বাচন না করে নেতাদের অনেকে অন্য দলের ব্যানারে নির্বাচন করতে চান। এখানে আমাদের বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই। তবে আমরা নির্বাচনে তাদের নিরুৎসাহিত করি।’

হেফাজতের প্রস্তাবিত নতুন কমিটিতে সাংগঠনিক পদের জন্য বিবেচিত হয়েছেন সংগঠনের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। তিনি বলেন, ‘২০১৮ সালের নির্বাচনে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হয়ে ৩০ থেকে ৩৫ জন হেফাজত নেতা ভোটের মাঠে ছিলেন। হেফাজতে ইসলাম তাদের কাউকে সমর্থন করেনি। আবার তাদের বর্জনও করেনি।’

রাজনৈতিক দল নিয়ে কীভাবে অরাজনৈতিক সংগঠন হয়– এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘১৩ দফা দাবি নিয়ে হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এসব দাবিতে যেসব ইসলামী দলের সমর্থন আছে, তারাই হেফাজতের জোটে আসার সুযোগ পেয়েছে। হেফাজতে ইসলাম রাজনীতি নিষিদ্ধ করে প্রাধান্য দিয়েছে এই ১৩ দফাকে।’

মুখে স্বীকার না করলেও হেফাজতে ইসলামের একটি অংশ চায় তাদের নেতারা নেতৃত্বে আসুক। সংগঠনটির ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নে নির্বাচনে অংশগ্রহণকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখছেন এসব নেতা।

২০১০ সালে হেফাজতে ইসলাম গঠন করা হয়। ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলনের বিরোধিতা করে হেফাজতে ইসলাম পরিচিতি পায়। এর পর থেকে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা নিষিদ্ধ করা, নাস্তিকদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিসহ ১৩ দফা দাবি জানিয়ে আসছে তারা।

শাহ আহমদ শফি জীবদ্দশায় বারবার বলেছেন, ‘হেফাজতে ইসলাম কোনো রাজনৈতিক দল নয় এবং আমরা কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করব না।’ বর্তমান আমির মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীও অভিন্ন কথা বলছেন বারবার। তবে কিছু নেতাকে বারবার সক্রিয় দেখা যাচ্ছে রাজনীতিতে। রাজনৈতিক দলের সঙ্গেও নানাভাবে যোগাযোগ রয়েছে তাদের। হেফাজতের একটি অংশের সখ্য রাখছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে। আরেকটি অংশ যোগাযোগ রক্ষা করছে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে।

নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, হেফাজতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ততই বাড়াচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। বিএনপি ও জামায়াত চাচ্ছে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত হোক হেফাজতে ইসলাম। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল চাচ্ছে হেফাজতের সমর্থন যাতে তাদের দিকে থাকে। এ জন্য উভয় দলের নেতারা বিভিন্ন সময় এসে দেখা করছেন হেফাজত নেতাদের সঙ্গে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট অঞ্চলে হেফাজতে ইসলামের নিজস্ব কর্মীবাহিনী আছে। সারাদেশে কওমি মাদ্রাসার বর্তমান ও সাবেক কয়েক লাখ শিক্ষার্থীকে তাদের সমর্থক মনে করে হেফাজতে ইসলাম।

হেফাজতে ইসলামের কয়েকজন নেতা এর আগে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিজয়ী হয়েছেন। গত নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মুফতি ফায়জুল্লাহ রাঙ্গুনিয়া থেকে নির্বাচন করতে আগ্রহ দেখান। এবারও তিনি এ আসন থেকে নির্বাচন করতে চান।

ইসলামী ঐক্যজোটের হেফাজত নেতা ফায়জুল্লাহ এর আগে বলেছিলেন, ‘আমি হেফাজতে ইসলামের প্রার্থী নই। তবে ইসলামী ঐক্যজোটের প্রার্থী। আমি চট্টগ্রাম-৬ (রাঙ্গুনিয়া) আসন থেকে নির্বাচনে দাঁড়ানোর পরিকল্পনা করছি।’

২০১৮ সালের নির্বাচনে হেফাজতে ইসলামের তৎকালীন কেন্দ্রীয় নেতা ও নেজামে ইসলাম পার্টির নির্বাহী সভাপতি মুফতি ইজহারুল ইসলাম চৌধুরী চট্টগ্রাম-১৫ (বাঁশখালী) আসন থেকে নির্বাচন করতে উদ্যোগী হন। আগে তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তখন সংগঠনটির তৎকালীন প্রধান মুফতি ফজলুল হক আমিনী সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে তাঁকে দল থেকে বাদ দেন। এবারও নির্বাচন করতে পারেন মুফতি ইজহারুল ইসলাম।

ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং চট্টগ্রাম ইউনিটের সভাপতি মাইনুদ্দিন রুহি চট্টগ্রাম-৪ (হাটহাজারী) থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে তৎপরতা শুরু করেন। তখন তিনি হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এখন দলে কোণঠাসা তিনি।

ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন যুগ্ম সম্পাদক এবং হেফাজতের গাজীপুর ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক মওলানা ফজলুর রহমান গাজীপুর-১ আসন, ইসলামী ঐক্যজোটের সাবেক প্রধান মুফতি ফজলুল হক আমিনীর ছেলে ও দলের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান এবং হেফাজতের ঢাকা সিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসনাত আমিনী ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন, ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন অফিস সেক্রেটারি ও হেফাজতের সহকারী সাধারণ সম্পাদক মুফতি আলতাফ হোসেন কুমিল্লা-১ আসন, ইসলামী ঐক্যজোটের কেন্দ্রীয় নেতা ও হেফাজতের তৎকালীন নবীনগর ইউনিটের সভাপতি মওলানা মেহেদী হাসান ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৫ আসন, ইসলামী ঐক্যজোটের তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান ও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির মাওলানা আব্দুল হামিদ মুন্সীগঞ্জ-১ থেকে নির্বাচন করতে তৎপর ছিলেন। এসব নেতার অনেকে এবারও অংশ নিতে পারেন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। তবে কোন দলের কিংবা কোন জোটের ব্যানারে গিয়ে তারা নির্বাচন করবেন তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি।

R/N

আমাদের তথ্যচিত্র গান কবিতা নাটক ভালো লাগলে ফেসবুকে শেয়ার করুন।

এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ

0Shares