জাতীয় ডেস্ক:
রাষ্ট্রমালিকানাধীন ছয়টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ বর্তমানে ১ লাখ ৪৭ হাজার ৭৭৬ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এসব ব্যাংকের মধ্যে সব চেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ রয়েছে জনতা ব্যাংকের। ব্যাংটির খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৭৫ হাজার ৩৯৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। এ ছাড়া অগ্রণী ব্যাংকের ২৯ হাজার ২৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, রূপালী ব্যাংকের ১৯ হাজার ২৮১ কোটি ৭৪ লাখ, সোনালী ব্যাংকের ১৫ হাজার ৪৮ কোটি ৩৯ লাখ, বেসিক ব্যাংকের আট হাজার ১৩১ কোটি ৯ লাখ এবং বাংলাদেশে ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৮৮৮ কোটি ৭৯ লাখ টাকা।
রোববার ( ০৬ সেপ্টেম্বর ) জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে জামায়াতে ইসলামীর মো. আব্দুল আলীমের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকের শুরুতে প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠিত হয়।
ঋণ খেলাপির দায়ে অভিযুক্ত এস আলম গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার বিষয়ে এনসিপির আবদুল হান্নান মাসউদের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘একটি দেশের অর্থনীতি পরিচালনায়, অর্থনৈতিক ফিন্যান্সিয়াল সেক্টর পরিচালনায় কতগুলো নীতি আছে। ব্যক্তির পরিচয় আর প্রতিষ্ঠানের পরিচয় ভিন্ন। ইটস আ লিগ্যাল এনটিটি, করপোরেট এনটিটি। আপনি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করতে পারবেন, তাঁকে জেলে দিতে পারবেন, ফাঁসিও হবে। বাট দ্য কোম্পানি ইজ আ লিগ্যাল বডি, কোম্পানিকে সেপারেট করে কোম্পানির কার্যক্রম চলতে দিতে হবে, সেটা যে কোম্পানিই হোক।’
অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘আজকে বাংলাদেশে যেকোনো কোম্পানি কোনো ব্যক্তির কারণে বন্ধ করে দিলে…সেই কোম্পানিতে বহু লোকজন চাকরি করে। সেই কোম্পানির দায় আছে, সেই কোম্পানির ঋণ পরিশোধ করতে হবে। সেই কোম্পানির অর্থনীতিতে আপনার কন্ট্রিবিউশন আছে। ওই কোম্পানির এমপ্লয়মেন্টের ক্ষতি করে…বন্ধ করে দিয়ে কোনো দেশের কোনো অর্থনীতি চলতে পারে না। কিন্তু যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত, সেই কোম্পানির সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মামলা চলছে এবং সে মামলা অব্যাহত থাকবে। তাদের বিচার হবে তাদের ব্যক্তিগত দুর্নীতির জন্য। কোনো কোম্পানিকে আপনি বন্ধ করে দিয়ে দেশের অর্থনীতির ওপর যে ইমপ্যাক্ট পড়বে, আপনাকে সেটা হিসাব করতে হবে। ইমোশনের ওপর অর্থনীতি চলে না। আইনের ওপর অর্থনীতি চলতে হবে।’
মন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক আইন ভঙ্গ করে কাউকে কোনো ঋণ দিচ্ছে না। যেখানে পুনঃতফসিলের সুযোগ আছে সুযোগ আছে, সেখানেই করতে দেওয়া হচ্ছে। আইনের পরিপ্রেক্ষিতে সে সুযোগ যে কোম্পানিগুলো নিতে পারে তারা নেবে। যারা নিতে পারবে না, তারা নিতে পারবে না। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে যারা দুর্নীতিগ্রস্ত তাদের বিচার হবে। তাদের বিচার চলছে এবং চলতে থাকবে।’
এর আগে সম্পূরক প্রশ্নে হান্নান মাসউদ বলেন, বাংলাদেশ এখন বিশ্বের মধ্যে ঋণ খেলাপির দিক থেকে চ্যাম্পিয়ন। অন্যতম শীর্ষ ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠান এস আলমের মালিকানাধীন এসএস পাওয়ারকে ৩১ লাখ ৯৭ হাজার ৫৬১ ডলারের এলসি খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এস আলম গ্রুপের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে বর্তমানে ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। তিনি জানতে চান, ‘সরকার এসব ঋণ খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে নিলামে তুলে কিংবা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত না করে, বিশেষ ঋণ দেওয়ায় মূলত ঋণ খেলাপিদের উৎসাহিত করছে কি না, এর মাধ্যমে বিদেশি ঋণদাতারা বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুৎসাহিত হবে কী না?’
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য নূরুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে ঋণ বা অর্থায়নের শর্তাবলিতে বর্তমান সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হলো—জনগণ তথা জাতীয় স্বার্থ। বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্যান্য খাতে সব ধরনের ভর্তুকি একযোগে প্রত্যাহারের কোনো নীতি সরকার গ্রহণ করেনি। কৃষি, খাদ্য ও বিদ্যুতের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখা হচ্ছে। উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান হলো—জাতীয় স্বার্থ, আর্থিক সক্ষমতা ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পর্যায়ক্রমে সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য রেহানা আক্তার রানুর প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বিশ্বব্যাংক ৯টি প্রকল্পের জন্য দুই হাজার ৮৪৪ দশমিক ৫০ মিলিয়ন ও ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে ৭টি প্রকল্পের জন্য ৮২০ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থায়ন চুক্তি স্বাক্ষরিত রয়েছে।’
কক্সবাজার-৩ আসনের লুৎফর রহমানের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে বেসরকারিভাবে পরিচালিত ১৩টি বাণিজ্যিক ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
এই সংসদ সদস্যের অপর এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১০ হতে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বিদেশ হতে ৮১ দশমিক ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ গ্রহণ করা হয়েছে। একই সময়ে সরকারের বৈদেশিক ঋণের বিপরীতে আসল ও সুদ পরিশোধ করা হয়েছে যথাক্রমে ১৭ দশমিক ১১ বিলিয়ন ও ৬ দশমিক শূন্য ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
কুষ্টিয়া-১ আসনের রেজা আহাম্মেদের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, বর্তমানে (৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত) দেশের জনগণের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ এক লাখ ২৯ হাজার ২৩৯ টাকা।
মন্ত্রী জানান, জনগণের মাথাপিছু ঋণের বোঝা কমানোর লক্ষ্যে সরকার রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, সরকারি অর্থের সুষ্ঠু ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল করার ওপর গুরুত্বারোপ করছে। সরকারি নিজস্ব আয় বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণের প্রয়োজনীয়তা কমানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি ব্যয়কে অধিকতর সাশ্রয়ী ও ফলপ্রসূ করার এবং অপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সরকারের অর্থায়ন চাহিদা কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সামগ্রিকভাবে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির পরিকল্পনা, সরকারি ব্যয় ও ঋণের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, উন্নত নগদ ব্যবস্থাপনা এবং বাজারভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থাপনার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারের ঋণ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা ও দীর্ঘ মেয়াদে জনগণের ওপর ঋণ চাপানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
চুয়াডাঙ্গা-৪ আসনের মো. রুহুল আমিনের প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ গ্রহণকারী ১৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮২ জন কৃষকদের ঋণ সুদসহ মওকুফ করা হয়েছে। এসব কৃষকদের কাছে ব্যাংকের প্রাপ্য এক হাজার ৩৫২ কোটি ৭৪ লাখ টাকা সরকার পরিশোধ করেছে।
সংরক্ষিত আসনের ফরিদা ইয়াসমিনের প্রশ্নের জবাবে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘২০১০ হতে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চোরাচালানিদের কাছ থেকে দুই হাজার ৫১৮ কেজি ৬৬৮ গ্রাম সোনা ও ৩৭৭ কেজি ৩৪৮ গ্রাম রুপা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।’